বিদেশি ক্রেতারা তৈরি পোশাক নিয়ে অনৈতিক বাণিজ্য করছে

বাংলাদেশে তৈরি পোশাক নিয়ে বিদেশি বায়ার বা ক্রেতারা অনৈতিক বাণিজ্য করছে বলে অভিযোগ করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে একটি তৈরি পোশাক পাঁচ ডলারে কেনা হয়। এরপর বিশ্ববাজারে ২৫ ডলার কিংবা এরও বেশি দামে সেটি বিক্রি হয়। তাহলে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় ওই ২০ ডলার কোথায় যায়? আমরা পাঁচ ডলার নিয়ে আলোচনা করছি; কিন্তু বাকি ২০ ডলার কোথায় যায়— তা নিয়ে কারও কোনও কথা নেই।’
রবিবার (২৩ এপ্রিল) বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত নিয়ে সামাজিক সংলাপ বিষয়ক এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন রেহমান সোবহান। এসময় তিনি বলেন, ‘বিদেশি বায়াররা (ক্রেতা) বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের দাম নিয়ে অনৈতিক বাণিজ্য করছে। রানা প্লাজার মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরও শ্রমিকদের উন্নয়নে বড় ধরনের কোনও পদক্ষেপ নেয়নি তারা। এমনকি তৈরি পোশাকের দামও বাড়ায়নি।’
সংলাপে সিপিডি চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘দেশের মালিক-শ্রমিকের মধ্যে সম্পর্ক ও সমন্বয় থাকলে রানা প্লাজার মতো এত বড় দুর্ঘটনা ঘটত না। জনপ্রতিনিধিরাও এ ঘটনার পর্যালোচনা করেননি। রানা প্লাজা ইস্যুতে কেবল জাতীয় সংসদ নয়, সংসদীয় কমিটিতেও কোনও আলোচনা হয়নি। রাজনৈতিকভাবে যে নজরদারির প্রয়োজন, এ ক্ষেত্রে তা দেখা যায়নি। আমরা যতই আলোচনা করি না কেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার না থাকলে কোনও সমস্যার সমাধান হবে না।’ তিনি বলেন, ‘গত চার বছরে সংস্কারে প্রচুর ঘাটতি ছিল। শুধু নীতিকথা বললেই হবে না, সংস্কার করতে হবে। ক্রেতা, উদ্যোক্তা ও সরকারের মধ্যেকার সম্পর্কের সমতা দরকার। সরকারের সুশাসনে (গভর্যারেন্স সিস্টেম) দুর্বলতা রয়েছে।’
গুলশানের গার্ডেনিয়া গ্র্যান্ড হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত নিয়ে সিপিডি ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) যৌথ আয়োজনে ওই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে সংলাপটির সঞ্চালনা করেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন।

সংলাপে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘রানা প্লাজা ধ্বসের পর বেশকিছু উদ্যোক্তা ব্যবসা ছেড়েছেন। এই ঘটনার পর ট্রেড ইউনিয়ন, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিয়ে যে পরিমাণ অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। দেশে ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু কার্যকারিতা কম। রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্তরা পর্যাপ্ত সাহায্য-সহযোগিতা পায়নি।’ তাদের পুনর্বাসনও হয়নি বলেও দাবি করেন সিপিডির এই ফেলো।
শ্রম সচিব মিকাইল সিপার সংলাপে বলেন, ‘রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর সরকার যথেষ্ট সচেতন হয়েছে। ভবিষ্যতে শ্রমিকদের উন্নয়নে উদ্যোগ নিতে সচেষ্ট সরকার।’
বিকেএমইএ’র সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, ‘পাঁচ ডলারে পোশাক বিক্রি করতে ক্রেতাদের বিস্তারিত জানাতে হয়। কিন্তু বিদেশি ক্রেতারা যখন ২৫ ডলারে পোশাক বিক্রি করেন, তখন সেই পোশাকে লেখা থাকে না যে এটি কত টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে।’
বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ‘বিদেশে ক্রেতারা তাদের ব্যবসা দেখবে; দাম বাড়ানোর চাপ দিলে তারা ইথিওপিয়া বা পাশের দেশ ভারতে চলে যাবে। গার্মেন্টস খাতকে এগিয়ে নিতে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে ভারত— বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।’
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের পরিচালক শামসুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, ‘রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর আমাদের সক্ষমতা বেড়েছে। গার্মেন্টস পরিদর্শন বাড়িয়ে দিয়েছি। শ্রমিকদের ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলছে।’
শ্রমিক নেতা কামরুল ইসলাম বলেন, ‘রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় বিদেশি সংস্থা থেকে ক্ষতিপূরণের একটি প্যাকেজ পেয়েছি। আইনানুগ কোনও ক্ষতিপূরণ পাইনি। স্পেকট্রাম গার্মেন্টস দুর্ঘটনার পর শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হলেও রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর গত ৪ বছরে শ্রমিকদের কোনও স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়নি।’
আরেক শ্রমিক নেতা বাবুল আক্তার বলেন, ‘শুধু আলাপ-আলোচনা হয়, কিন্তু আর কিছুই না।’ সরকার মন থেকে কিছু করেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘উল্টো সামাজিক সংলাপের নামে শ্রমিকদের ডেকে নিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *