আন্তর্জাতিক

‘আশার মাঝেই নতুন সংকট রাজনৈতিক সংঘাত’

ডেস্ক রিপোর্ট: বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু ফরাহ মো. নাছের বলেছেন, মনিটারি পলিসিতে (মুদ্রানীতি) এবং ফিসক্যাল পলিসিতে (রাজস্ব নীতি) সমহারে কন্ট্রোল চলছে। এই কারণে দেখবেন যে ডিসেম্বরের মধ্যে ইনফ্লেশন অনেকটা কমবে। যতো চ্যালেঞ্জই হোক। নতুন এই আশাবাদের সঙ্গে দুশ্চিন্তার কথাও জানালেন তিনি।

ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের কারণে তেলের মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা আর চলমান সংঘাতময় রাজনৈতিক কর্মসূচি অর্থনীতিতে নিশ্চিতভাবেই বাড়তি চাপের কারণ হবে বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারক। যা আগামী জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসা সরকারের জন্য অবধারিত চ্যালেঞ্জ বয়ে আনবে, সেই শঙ্কাও জানালেন তিনি।

বিএনপি-জামায়াতের তিন দিনব্যাপি অবরোধ কর্মসূচির দ্বিতীয় দিনে চলমান ঘটনাপ্রবাহে আর্থিক খাতের ঝুঁকি নিয়ে বার্তা২৪.কম এর সঙ্গে কথা বলেছেন ডেপুটি গভর্নর আবু ফরাহ মো. নাছের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পরিকল্পনা সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম।

বার্তা২৪.কম: সমসাময়িক যে ঘটনাপ্রবাহ তাতে তো সবচেয়ে চাপে পড়েছে অর্থনীতিই। এর প্রভাব প্রান্তিক মানুষদের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ছে। আর্থিক খাতে যে চ্যালেঞ্জগুলো তৈরি হচ্ছে চলমান রাজনৈতিক কর্মসূচিতে, বাংলাদেশ ব্যাংক বিভাবে মোকাবেলা করছে? আপনাদের দিক থেকে কি কি পদক্ষেপ রয়েছে…

আবু ফরাহ মো. নাছের : এখন আমাদের চ্যালেঞ্জ বলতে গেলে মেইনলি প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো ইনফ্লেশন (মূল্যস্ফীতি), দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো সত্যিকারর্থে রিজার্ভ ও ডলার। আরেকটি যদি বলেন (বাজে সংস্কৃতি বলব) খেলাপি ঋণ। আমার বিবেচনায় এই মুহুর্তে এই তিনটি চ্যালেঞ্জ। এখন ইনফ্লেশনকে কন্ট্রোল করতে না পারলে ক্রাইসিস আরও বেড়ে যাবে। এটি কন্ট্রোল করা জরুরি। শুধুমাত্র সেন্ট্রাল ব্যাংক নয়। দুইভাবে করতে হবে। সেন্ট্রাল ব্যাংক একটি প্রিকশন, অন্যটি সরকারকে নিতে হবে। ফিসক্যাল ও মনিটারি পলিসি-দু’টি একসঙ্গে পারফর্ম না করলে ইনফ্লেশনকে কমানো সম্ভব নয়; যদিও থিওরিটিক্যাললি বলা হয় সেন্ট্রাল ব্যাংক এটি নিয়ন্ত্রণ করবে; তবে ডেভেলপিং কান্ট্রিতে এককভাবে কেন্দ্রিয় ব্যাংক এটি করতে পারে না। সেন্ট্রাল ব্যাংক ও ফিসক্যাল পলিসি-এসঙ্গে কাজ করলে তবেই এটি সম্ভব হতে পারে।

তবে আপনাকে জানাতে পারি, এখন কিন্তু এটি চলছে। সরকারকে আমরা অনুরোধ করেছি, সরকারও মেনে নিয়েছে-যেটা ডিভোল্ড করা হয় সেটা বন্ধ করা হয়েছে। এই কারণে মনিটারি পলিসিতে এবং ফিসক্যাল পলিসিতে সমহারে কন্ট্রোল চলছে। এই কারণে দেখবেন যে ডিসেম্বরের মধ্যে ইনফ্লেশন অনেকটা কমবে। যতো চ্যালেঞ্জই হোক। তবে এটাতে আবার নতুন করে প্রভাব ফেলবে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের কারণে যদি তেলের দাম আবার বেড়ে যায় তবে আমাদের জন্য বাড়তি চাপ হবে। আমরা যে প্ল্যানিং নিয়ে এগুচ্ছিলাম, সেই প্ল্যানিংটাকে বাধাগ্রস্ত করবে এই প্যালেস্টাইন যুদ্ধ। আরেকটা হচ্ছে রিজার্ভ; ডলারকে তো আমরা কনটেন্ট করতে পারছি না, ডলার কমে যাচ্ছে। যেহেতু গার্মেন্টস ছাড়া অন্য সকল এক্সপোর্ট কিন্তু কাঙ্খিত পর্যায়ে নাই। না, এটারও লজিক কারণ হলো, যাদের কাছে আমরা এক্সপোর্ট করতাম তাদের দেশেও তো সমস্যা। আগে যে সমস্ত দেশের লোক একটা নতুন শার্ট কিনে ৫ দিনে পড়ে ফেলে দিতো এখন সে কিন্তু এটাকে ওয়াশ করে আবার পড়ছে। এর ফলে ভলিউম অব এক্সপোর্ট কিন্তু সেইভাবে বাড়ছে না। তথাপিও আমাদের গার্মেন্টস এক্সপোর্ট পজেটিভ আছে। কিন্তু অন্যান্য বড় খাতগুলো, যেমন-কৃষি, কেমিকেল, পাট, চামড়া-এসব রপ্তানি কিন্তু বাড়ছে না। গত বছরের তুলনায় কমছে। সঙ্গতঃ কারণেই আমাদের রপ্তানি আশানুরূপ নয়। যদি ব্যাংকের কাছে একসেস ডলার লিকুইডিটি যদি না বাড়ে তাহলে কিন্তু আমাদের রিজার্ভে টাকা আসে না। রিজার্ভের দু’টি সোর্স, একটি যখন দেশে এফডিআই বাড়ে, যখন বৈদেশিক লোন বেশি নেওয়া হয় আর যখন এক্সপোর্ট এবং রেমিটেন্স যখন বাড়ে, ব্যাংকের একসেস ফান্ডটা যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিক্রি করে তবেই কেবল রিজার্ভ পজিশন বাড়ে। এখন আমাদের শুধু একটাই-বৈদেশিক লোনের কিস্তিগুলো ছাড় হলে কিছু রিজার্ভে আসে, এছাড়া রিজার্ভে আর আসছে না। এফডিআই বন্ধ, রেমিটেন্স সেভাবে আসছে না। এই মাসে দেখবেন যে প্রায় ২ বিলিয়নের কাছাকাছি হবে ১.৯ বিলিয়নের কাছাকাছি হবে ইনশাল্লাহ আশা করা যায়। আরও কিছু ব্যাংক যেহেতু স্পেশাললি রেমিটেন্সের জন্য ইনসেনটিভ দিচ্ছে আলাদা করে আড়াই পারসেন্ট। ৫ পার্সেন্ট হওয়ার কারণে রেমিটেন্স কিছুটা বাড়বে আশা করছি…এই হচ্ছে দু’টো। আর তৃতীয়তঃ হচ্ছে খেলাপি ঋণ। একদিকে আমাদের এখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশি, যেমন ধরুন কিছু কিছু প্রোডিউসার ডলার ক্রাইসিসের জন্য যখন ইমপোর্টটা করেছে তখন ধরে নিন বিক্রি করেছে ১১০টাকা করে পার কেজি কিন্তু ৬ মাস ডেফারেল পেমেন্ট করার কারণে এখন যে পেমেন্ট করতে হচ্ছে এখন কিন্তু আগের চেয়ে বেশি দরে ডলার কিনে বিক্রি করতে হচ্ছে পরিশোধ করতে হচ্ছে। এখানে ক্যাশ ইনফ্লোটা কমে যাচ্ছে। সঙ্গত কারণে সে কিন্তু ব্যাংকের লোন পেমেন্ট করতে পারছে না। এটা হলো খেলাপী হওয়ার আরেকটি কারণ। যখন সে মালামালটা ইমপোর্ট করে এনে বিক্রি করছে ১১০টা, এখন যখন ডলারটা পেমেন্ট করছে ১১৫টা করে। ৫টা লোকসানের কারণে ক্যাশ ইনফ্লোটিা কমে যাচ্ছে, ফলে খেলাপীর পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে-এসবই হচ্ছে টেকনিক্যাল সমস্যা। 

বার্তা২৪.কম: বিদ্যমান এসব চ্যালেঞ্জের সঙ্গে আরেকটা চ্যালেঞ্জ যোগ হলো চলমান রাজনৈতিক সংকট এবং সহিংসতা।

আবু ফরাহ মো. নাছের: এসবের প্রভাবের দিকে গেলামই না কিন্তু সহিংসতা যতো বাড়ছে উৎপাদন ততোই কমছে। উৎপাদন কমে গেলে সমস্যা বাড়বে। সহিংসতা একটি বড় জিনিস…ইলেকশনের পরে যিনিই ক্ষমতায় আসুন না কেন, তার জন্য এটি ক্ষতিকর। পাকিস্তান আমলে আমরা হরতাল করেছি, পাকিস্তান শাসন উৎখাত করেছি কিন্তু হরতালের ক্ষতি সারতে অনেক বছর লেগে গেছে। এই যে তিন দিনের অবরোধের ফলে যাদের রপ্তানি করার কথা তারা তো রপ্তানি করতে পারছেন না। এই যে সময় মতো যেতে না পারলে ক্ষতি হচ্ছে; এটা রাষ্ট্রের ক্ষতি হচ্ছে। 

বার্তা২৪.কম: উদ্ভুত পরিস্থিতিতে আপনারা কি কোন পদক্ষেপ নিয়েছেন-

আবু ফরাহ মো. নাছের: আমরা তো চেষ্টা করছি যাতে রপ্তানিটা বাধাগ্রস্ত না হয়। এইটাই হলো মূল কারণ। একবারে বন্ধ করে দিতে বলেছিল ইডিএফ, আমরা কিন্তু করি নি। হয়তো কিছুটা কমিয়ে নিয়ে এসেছি কিন্তু টাকা এখনো দিয়ে যাচ্ছি। আমরা চেষ্টা করছি লোন যাতে পায়, প্রাইসিং বেড়ে যাওয়াতে…আগে যে লোনের লিমিট ছিল, লিমিটি বৃদ্ধি করার কথা বলছি; কারণ বৃদ্ধি করে দিলেই …আগে ইসপোর্টে মালামাল লাগতো, ধরুন একশ’ ডলারের জন্য দশ হাজার টাকা। এখন তো একশ’ ডলারেই মালামাল আনছে কিন্তু টাকা লাগছে হয়তো পনের হাজার টাকা বা বারো হাজার টাকা, এই লিমিটটা যেন ব্যাংক বৃদ্ধি করে দেয় ব্যাংকগুলোকে তা বলে দিয়েছি; যাতে সে ওয়ার্কিং ক্যাপিটালটা পায়। এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট যেন বাধাগ্রস্ত না হয় তা বলে দিয়েছি। অন্য ক্ষেত্রে মার্জিন বেশি নিলেও এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে বিবেচনার কথা বলেছি। ইন্ড্রাস্ট্রি আর এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড বিষয়গুলো যেন বাধাগ্রস্ত না হয়।  সরকারের দিক থেকে… যাতে উৎপাদন ব্যাহত না হয়;  সার, বিদ্যুত এবং জ্বালানি ইমপোর্ট যেন বাধাগ্রস্ত না হয় সেবিষয়ে আমরা বলছি।

বার্তা২৪.কম: চলমান অবরোধে পণ্য আনা-নেওয়াও তো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে-

আবু ফরাহ মো. নাছের: আমদানিকারকরা এই পরিস্থিতিতে যথাসময়ে পণ্য না পেলে না নেওয়ার অযুহাত খোঁজে। মূল্য কমিয়ে দেয়।

বার্তা২৪.কম: এছাড়া ব্যাংক গুলোকে চলমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় যেসব নির্দেশনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তরফে দেওয়া হয়েছিল তা তো সবই বলবৎ আছে…

আবু ফরাহ মো. নাছের: হ্যা, সবই বলবৎ আছে। যেহেতু অনেকেই পারছে না তাল মেলাতে, সেহেতু আমরা চেষ্টা করছি এসএমই ল্যান্ডিংটা বৃদ্ধি করার জন্য…কালকেই পাস করিয়ে এনেছি। নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ, তারপর এগ্রো বেজড ঋণগুলোকে আমরা ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের আওতায় ঋণ দেব যাতে কোলেটারাল ছাড়াও তারা লোনটা পাইতে পারে।

আরও পড়ুন: ‘দেশ যদি ডুবেই যায় তবে কার জন্য পলিটিক্স?

চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে পারে

সংবাদটি প্রথম প্রকাশিত হয় বার্তা ২৪-এ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *