আন্তর্জাতিক

জিম্মি-মুক্তিতে সক্ষমতা প্রমাণের পরীক্ষা

ডেস্ক রিপোর্ট: ভারত মহাসাগরে সোমালিয়ার জলদস্যুদের কবলে পড়া বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজের জিম্মি ২৩ নাগরিকের সুস্থভাবে ফিরিয়ে আনা অগ্রাধিকার এখন। জিম্মি বাংলাদেশিদের উদ্ধার করতে সরকারকে কূটনৈতিক চ্যানেলসহ সম্ভাব্য ‘যেকোনো’ পথ অনুসরণ করে ফিরিয়ে আনতে হবে। সময় এখন সরকারের সক্ষমতা প্রমাণের।

গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের কবির গ্রুপের সহযোগী সংস্থা কেএসআরএম-এর মালিকানাধীন জাহাজটি দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিক থেকে কয়লা নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত যাওয়ার পথে ভারত মহাসাগরে সোমালিয় জলদস্যুদের কবলে পড়ে। আক্রান্ত হওয়ার পর পরই জিম্মিদের কাছ থেকে যে বার্তা এসেছে সেটা দেশবাসীকে উদ্বিগ্ন করেছে। দেশে থাকা তাদের পরিবারগুলো মুহূর্তেই অসহায় হয়ে পড়েছে। জিম্মিদের মতোই প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার তারা। জিম্মিদের পরিবার জাহাজের মালিকপক্ষের কাছে যাচ্ছে, মালিকপক্ষ তাদের মতো করে চেষ্টা করছে, সরকারের সহযোগিতা চাইছে।

দেশের বাইরে কিছু ব্যক্তি পর্যায়ে ঘটলেও তার মোকাবেলা করতে হয় সরকারকে। সরকার করেও থাকে। ২৩ বাংলাদেশি জিম্মির ঘটনা বাণিজ্যিক জাহাজে ঘটেছে, এবং জাহাজটি সরকারি মালিকানার না হলেও এটা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অংশ, এবং বাংলাদেশের পতাকাবাহী। এখানে তাই সরকারকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

আশার কথা ঘটনা অবহিত হওয়ার পর থেকেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলরা তৎপর হয়েছেন। কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করতে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকও হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বুধবার বলেছেন, ‘আমরা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে চেষ্টা করছি এবং যেখানে জানানো প্রয়োজন, সেখানে জানিয়েছি। ইতোমধ্যে রিপোর্টিং সেন্টার ইন কুয়ালালামপুর, ইন্ডিয়ান ফিউশন সেন্টার ইন নিউ দিল্লি, তারপর সিঙ্গাপুর, ইউএসএ, ইউকে, চায়নাসহ সব এরিয়াল নেভাল শিপে আমরা রিপোর্ট করেছি। অন্যান্য সূত্রের মাধ্যমেও আমরা যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি।’ এখানে সরকার নির্ধারণ করুক কর্মকৌশল। এখানে মুক্তিপণ দেওয়ার বিষয় আছে কি-না, সেটা আমাদের দেখার ও জানার বিষয় নয়। জিম্মি নাগরিকদের পরিবার ও দেশবাসী কেবলই তাদের ফিরে আসার অপেক্ষার রয়েছে।

সোমালিয়া উপকূলে নোঙর করল জলদস্যুর কবলে পড়া জাহাজ
৩০ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও জলদস্যুরা যোগাযোগ করেনি
জলদস্যুর কবলে ২৩ নাবিক: মায়ের চোখে জল, স্ত্রী শয্যাশায়ী
নাবিক নাজমুলকে জীবিত ফিরে পেতে বাবা-মায়ের আকুতি

সোমালিয়া উপকূল থেকে প্রায় ৬শ নটিক্যাল মাইল দূরে জলদস্যুদের কবলে পড়া জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ আজ সোমালিয়া উপকূলের গারাকাদ বন্দর থেকে প্রায় ২০ নটিক্যাল মাইল দূরে নোঙর করেছে। ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ব্যুরোর বরাতে বৃহস্পতিবার দুপুরে জানিয়েছেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ শাখাওয়াত হোসেন। সংস্থাটির দায়িত্বশীলদের ধারণা জলদস্যুরা যোগাযোগ করতে কিছু সময় নিতে পারে।

নাবিকদের জিম্মি করে জাহাজের নিয়ন্ত্রণের মূল কারণ মুক্তিপণ। এই মুক্তিপণের পরিমাণ কত, কীভাবে এর দরকষাকষি হয়- এমন কিছু অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছে এমভি আব্দুল্লাহ জাহাজের মালিক প্রতিষ্ঠান। কবির স্টিল রোলিং মিলসের (কেএসআরএম) ‘এমভি জাহানমণি’ নামের একটি জাহাজ ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর ভারত মহাসাগরে জলদস্যুদের কবলে পড়েছিল। সেবার ২৬ জনকে জিম্মি করা হয়েছিল। ১০০ দিন পর তাদের মুক্ত করে আনা হয়েছিল। তখন কীভাবে এবং কত টাকা মুক্তিপণ দেওয়া হয়েছিল সেটা জানা যায়নি। আমরা মনে করি এটা জানারও দরকার নাই আমাদের, কারণ মূল আগ্রহের জায়গা হলো জিম্মিদের মুক্তি।

পূর্ব আফ্রিকা উপকূলে সমুদ্র-নিরাপত্তায় কাজ করা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌবাহিনী ইইউন্যাভ ফর আটালান্টার দেওয়া তথ্যে বিবিসি জানিয়েছে, গত বছরের নভেম্বরে থেকে এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসে সোমালি উপকূলে অন্তত ১৪ জাহাজ হাইজ্যাক করা হয়েছে। তন্মধ্যে কেবল ইরান ও লাইবেরিয়ার দুটি জাহাজের জেলে ও নাবিকদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। গত ডিসেম্বরে মাল্টার পতাকাবাহী একটি জাহাজ হাইজ্যাক হয়, যা এখনো দস্যুদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পূর্ব আফ্রিকার এই জলসীমা যে কতখানি ভয়ঙ্কর সেটা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে এরই মধ্যে উঠে এসেছে। জানা গেছে, কেবল ২০১৮ সালেই ওখানে ১১২ নৌডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে অবশ্য আশার কথা হচ্ছে, গত জানুয়ারিতে এক সপ্তাহে তিনটি অভিযানে ভারতের নৌবাহিনী ১১ জন ইরানি এবং ৮ জন পাকিস্তানিকে মুক্ত করতে সমর্থ হয়, যারা ছিল সোমালিয় জলদস্যুদের হাতে বন্দি।

জলদস্যুদের হাত থেকে জিম্মি বাংলাদেশিদের কীভাবে মুক্ত করা হবে, মুক্তিপণ দেওয়া হবে কিনা সেগুলো প্রকাশ্য আলোচনার বিষয় নয়। দেশবাসী কেবল আশ্বস্ত হতে চায়। এটা যদিও সময়সাপেক্ষ, তবে এখানে সরকারের সক্ষমতার বিষয়টি জড়িত। আগের বার যখন একই কোম্পানির অন্য একটি জাহাজ জলদস্যুদের কবলে পড়েছিল, তখন ছিল আওয়ামী লীগ সরকার, এখনো তাই; সে হিসেবে সরকারের এ-বিষয়ে অভিজ্ঞতাও রয়েছে। তৎসময় যারা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন সেই অভিজ্ঞদের অভিজ্ঞতাকে এবারও কাজে লাগানো যেতে পারে। 

‘এমভি আব্দুল্লাহ’ নামের জাহাজটি বর্তমানে জলদস্যুদের পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণে। এমন অবস্থায় তৃতীয় কারো সহায়তা নিয়েও এখানে বলপ্রয়োগের চিন্তা করাও যাবে না। এতে জিম্মি থাকা ২৩ বাংলাদেশিদের প্রাণ হারানোর আশঙ্কা থেকে যাবে। এমতাবস্থায় যেভাবেই হোক তাদের ফিরিয়ে আনা হোক অগ্রাধিকার সরকারের। সক্ষমতা প্রমাণের এই পরীক্ষায় সরকারকে পাস করতেই হবে!

সংবাদটি প্রথম প্রকাশিত হয় বার্তা ২৪-এ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *