খেলার খবর

এমন উইকেটে খেলিয়া আমরা কী করিব?  

ডেস্ক রিপোর্ট: আগে তাদের মন্তব্য শুনে নেই। 

টিম সাউদি, নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক– ‘সম্ভবত, আমার ক্যারিয়ারে খেলা সবচেয়ে বাজে উইকেট এটি।’

নাজমুল হোসেন শান্ত, বাংলাদেশ অধিনায়ক– ‘টেস্ট ক্রিকেটে আমরা উন্নতি করতে আসিনি। জিততে এসেছি। সেই জয়ের জন্য হোম অ্যাডভান্টেজ নিতে হবে।’

এটি তাদের সাম্প্রতিকতম মন্তব্য। এবার আরেকটু পেছনে ফিরে যাই। সিলেট আর্ন্তজাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সিরিজের প্রথম টেস্টে বড় হারের পর নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক বলেছিলেন, ‘এটি বেশ ভালো উইকেট।’ আর সেদিন ১৫০ রানে ম্যাচ জয়ী বাংলাদেশ অধিনায়কও সিলেট স্টেডিয়ামের টেস্ট উইকেট নিয়ে তার সন্তুষ্টির কথা জানান।

বিদেশি দলের বিরুদ্ধে টেস্টে জয়ের জন্য দেশের মাটিতে, আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে মিরপুরের মাটিতে বিসিবি যে স্লো, লো-বাউন্স এবং পুরোপুরি স্পিন সহায়ক উইকেট তৈরির পরিকল্পনা কষেছে সেটা বাংলাদেশ দলের জন্য কতখানিক কার্যকর? এই ধরনের উইকেটে খেলে কি টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ উন্নতি করতে পারবে? 

যেহেতু এই পরিকল্পনার সঙ্গে বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত নিজেই জড়িত, এই পরিকল্পনার উদ্ভাবক কোচ চন্ডিকা হাতুড়েসিংহে নিজেই, তাই তারা দুজন হার বা জিত যে কোনো পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণের একটা চেষ্টা চালাবেন। তবে মিরপুরের এমন উইকেট যে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ক্ষতি ছাড়া আর কোনো কিছুই করছে না সেটা দিনের আলোর মতোই পরিস্কার। বরং অন্যের জন্য খোঁড়া গর্তে বাংলাদেশ তো নিজেই খাবি খাচ্ছে।

-কিভাবে?

ঢাকা টেস্টে নিউজিল্যান্ডের কাছে হারটাই যে তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। সবকিছু নিজেদের মতো সাজিয়েও এখানে ম্যাচ জিততে পারল না বাংলাদেশ। বরং এই প্রেসক্রিপশনে বানানো উইকেটে খেলতে নেমে নিজ দলের ব্যাটসম্যানদের আত্মবিশ্বাসই চুরমার হয়ে যাচ্ছে। ঢাকা টেস্টের কথাই ধরুন। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ টিকলো মাত্র ৬৬.২ ওভার। দ্বিতীয় ওভারে গুটিয়ে গেল মাত্র ৩৫ ওভারে। নিউজিল্যান্ডও যে খুব বেশি কিছু করলো, তা নয়। স্পিনাররা বল করলেই মনে হচ্ছিল এই যেন আরেকটি উইকেট পড়লো! এমন একপেশে স্পিনবান্ধব উইকেট কোনো মতেই টেস্ট ব্যাটিংয়ের উপযোগী নয়। একটা বল নিচু হচ্ছে তো পরের বলই লাফিয়ে উঠছে! ম্যাচের প্রথম ওভার থেকে বল স্পিন করছে দুই তিন হাত সমান। নিউজিল্যান্ডের জন্য এমন উইকেটে খেলা টা ছিল অচেনা অজানা বিষয়। কিন্তু সেই তারাই এই উইকেটের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনায় দ্রুতগতিতে সবকিছু এমনকি কৌশলও আয়ত্ত্ব করে ফেললো। গ্লেন ফিলিপস দুই ইনিংসেই যে কায়দায় ব্যাট করলেন তেমনটা বাংলাদেশের কেউ করে দেখাতে পারলেন কই?

কি বুঝলেন? 

শুধু উইকেট বানালেই হবে না। সেখানে খেলার এবং জেতার দক্ষতা, যোগ্যতা এবং সামর্থ্যরে প্রমাণও রাখতে হবে। ঢাকা টেস্টে সেই লড়াইয়ে হেরে গেল বাংলাদেশ। তাহলে নিজ মর্জি মতো উইকেট বানিয়ে কি লাভ? সেই লাভ তুলে তো নিয়ে গেল অতিথি দল। নিউজিল্যান্ডের জন্য যে গর্ত বা ফাঁদ বানিয়েছিল বাংলাদেশ তাতে নিজেরাই ধরা! 

ঢাকা টেস্ট যদি বাংলাদেশও জিততো তাহলেও কি আমরা টেস্ট ক্রিকেটে অনেক দূর এগিয়ে যেতাম? রেকর্ডবুক হয়তো বলতো আমরা নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজ জিতেছি। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটেও কি ঐ দলের সমকক্ষ বা ধারে কাছে যেতে পেরেছি? টেস্ট ক্রিকেটের আসল কথাই হলো–লড়াই। দক্ষতা প্রদর্শনের পরীক্ষা। সেই পরীক্ষা এবং লড়াইয়ে বিরূপ পরিবেশেও নিউজিল্যান্ড ঠিকই জিতে গেছে। আর আমরা নিজেদের চেনা আঙিনায়, অসহায়ত্ব নিয়ে শেষ করলাম। নিজ হাতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বানালাম। আর পরীক্ষার হলে বসে উত্তর খুঁজতে গিয়ে ডাহা ফেল করে ফিরলাম।

এই ফেল করায় বিসিবি এবং টিম ম্যানেজমেন্ট যদি অমর্যাদা অনুভব না করে তাহলে বুঝতে হবে সন্মান সম্পর্কে তাদের জ্ঞান এবং বোধশক্তিও সম্ভবত হ্রাস পেয়েছে!

নিজেদের মাটিতে জিততে হলে পুরোদস্তুর স্পিন সহায়ক বা র‌্যাঙ্ক টার্নার উইকেট বানানোর যে প্রয়োজনীয়তা নেই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ তো সিলেট টেস্ট। সিলেটের উইকেটে স্পিন সহায়তা ছিল। কিন্তু সেখানে ব্যাটসম্যানদের জন্যও রান ছিল। তিনশ প্লাস ইনিংস হয়েছে দু’দলের। সেঞ্চুরি হয়েছে। আবার স্পিনাররাও দাপট দেখিয়েছেন। ব্যাটিং-বোলিংয়ের সেই সমান সমান উইকেটে যদি বাংলাদেশ ১৫০ রানে টেস্ট ম্যাচ জিততে পারে তাহলে মিরপুরে জয়ের জন্য কেন এবং কোন যুক্তিতে এমন ‘উইকেট খোর’ পিচ তৈরি করতে হবে? 

নিউজিল্যান্ডকে আমরা সিলেটের সুন্দর সাবলীল উইকেটে হারাতে পারি। এমনকি মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে তাদের ডেরায়ও হারিয়ে এসেছি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতেও বাংলাদেশ টেস্ট ম্যাচ জিতেছে। জিতেছে জিম্বাবুয়ে ও শ্রীলঙ্কায়। সেই সব জয়ে কোথাও কিন্তু স্পিনস্বর্গ ছিল না। কিন্তু নিজ মাটিতে টেস্ট জেতার জন্য কোচ চন্ডিকা হাতুড়েসিংহে যে স্পিনগর্ত বানানোর ফর্মূলা দিচ্ছেন সেটা সত্যিকার অর্থেই হাতুড়ে বটে!

এই টোটকায় কোচ হিসেবে হাতুড়েসিংহের কারিকুলাম ভিটায় কয়েকটি টেস্ট জয়ের নামফলক হয়তো যুক্ত হবে; তবে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিটা হয়ে যাবে বাংলাদেশের, বাংলাদেশের ক্রিকেটের।

এম. এম. কায়সার | সম্পাদক, স্পোর্টস বাংলা

সংবাদটি প্রথম প্রকাশিত হয় বার্তা ২৪ ডট কম-এ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *