আন্তর্জাতিক

সিরাজগঞ্জে খেজুর রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরিতে ব্যস্ত গাছিরা

ডেস্ক রিপোর্ট: রাতের কুয়াশা ও ভোরের শিশির যত বাড়ছে খেজুরের গুড়ের চাহিদাও তত বাড়ছে। তাই বাণিজ্যিকভাবে সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় খেজুর রস সংগ্রহ ও সুস্বাদু  গুড় তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন পেশাদার ও মৌসুমী গাছিরা। যা স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে চলে যাচ্ছে বিভিন্ন জেলায়।

এবার এই মৌসুমে জেলায় ২ কোটি ৩০ লক্ষ টাকার খেজুর গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে কৃষি অফিস।

সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের তথ্য মতে, সদর উপজেলায় ৪০, রায়গঞ্জে ৮০০, তাড়াশে ১ হাজার ৬২৬, উল্লাপাড়ায় ১ হাজার ৪৩৩, শাহজাদপুরে ২০০, বেলকুচিতে ৯৫ ও চৌহালীতে ৫৬টিসহ মোট ৪ হাজার ২৫০টি খেজুরের গাছ রয়েছে। এ বছর ১ লক্ষ ১৪ হাজার ৭৫০ কেজি খেজুরের গুড়ের বাজার মূল্য প্রায় ২ কোটি ২৯ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। শীতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ৭৫ দিনে জেলায় ২’শ থেকে ৩’শ জন মানুষ খেজুরের রস সংগ্রহ, গাছের পরিচর্যা ও গুড় তৈরির কাজে যুক্ত থাকেন। 

সোমবার (১৮ ডিসেম্বর) সকালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উত্তরবঙ্গের শস্য ও মৎস্য ভান্ডারখ্যাত জেলার তাড়াশ ও উল্লাপাড়ায় খেজুর গাছের সংখ্য বেশি। শীত মৌসুমের শুরুতেই রাজশাহী ও নাটোরের বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা গাছিরা মালিকদের কাছ থেকে খেজুর গাছ লিজ নেয়। শুরুর প্রথমদিকে প্রতিদিন পাটালি গুড় তৈরি হয়। এই গুড় বিক্রি হয় ২০০ টাকা কেজি দরে। তারপর মাঝামাঝি থেকে পুরো মৌসুমে প্রতিদিন পাটালি ও ঝোলা গুড় তৈরি করা হয়। প্রতি কেজি ঝোলাগুড় বাজারে পাইকারদের কাছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। এসব খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন পেশাদার ও মৌসুমী গাছিরা।

নাটোর থেকে রস ও গুড় তৈরি করতে আসা কালাম মিয়া, করিম উদ্দিন, সাইফুল ও জুলমাত শেখ জানান, কেউ ২৫ বছর আবার কেউ ২০ বছর ধরে এই কাজ করছেন। তারা জানান, প্রতিদিন বিকেলে খেজুর গাছের সাদা অংশ পরিষ্কার করে ছোট-বড় মাটির হাড়ি বেঁধে রাখা হয়। মাটির পাত্রের ভেতর রস পড়ার জন্য বাঁশের তৈরি নালার মতো ভিন্ন একটি খুঁটি পুঁতে দেওয়া হয় সেই গাছের সঙ্গে। এভাবেই আমাদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে খেজুর রস। পরদিন ভোরে এ সব গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে টিনের বড় পাত্রে জ্বাল দিয়ে পাটালি, ঢিমা ও লালি গুড় তৈরি হচ্ছে।

রাজশাহী থেকে আসা হেলাল উদ্দিন জানান, এ বছর ৩৫০টি গাছ লিজ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তুত করা প্রতিটি গাছ থেকে সপ্তাহে ৩ থেকে ৪ দিন রস সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি গাছ থেকে শুরুতে এক থেকে দুই কেজি করে রস সংগ্রহ হয় ও আস্তে আস্তে তা বাড়ে। প্রতিদিন ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ গাছের রস সংগ্রহ করা হয়। এক মণ রস চুলায় জ্বাল করার পরে বিক্রি উপযোগী ৫ কেজি পাটালি, ৭ কেজি দানা গুড় ও ৮ কেজি ঝোলাগুড় পাওয়া যায়।

গাছি আলি হোসেন, সরুজ মিয়া, শহিদুল ইসলাম, কাশেম আলী জানান, ‘গ্রামের ঘরে ঘরে খেজুর রসের পিঠা, পায়েস, গুড়ের মুড়ি-মুড়কি ও নানা ধরনের মুখরোচক খাবার তৈরির ধুম পড়েছে। বাজারে খেজুরের গুড়ের চাহিদা অনেক। গুড় তৈরির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন স্থানের পাইকাররা এসে গুড় কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে আমরা আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছি।’

স্থানীয় কুড়ান শেখ, মফিজ উদ্দিন, শাহেব আলী, সাগর হোসেন জানান, গ্রাম বাংলার প্রাচীন এক ঐতিহ্য খেজুরের গুড়। শীতের ভোরে গ্রামীণ জনপদে খেজুরের রস সংগ্রহে বেড়িয়ে পড়েন গাছি ও কৃষকেরা। কুয়াশা ভেদ করে সূর্য্য উকি দেওয়ার আগেই গ্রামের বাড়ি ও বিভিন্ন স্থানে মাটির চুলায় সেই রস জ্বাল করে গুড় তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। রস থেকে নানা ধরণের পাটালি এবং ঝোলা গুড় উৎপাদন হয়ে থাকে। তবে খেজুর গুড়ের ঐতিহ্য রক্ষায় চিনি ও হাইডোজ ব্যবহার বন্ধের জন্য প্রশাসনের নজর দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

তাড়াশের ধামাইনগর গ্রামে ঢাকা থেকে পাইকারি গুড় কিনতে আসা ফজলার রহমান বলেন, ‘খাঁটি খেজুরের গুড় পাইকারি প্রকার ভেদে ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি। তবে ভালো মানের গুড়ের দাম ২০০ টাকা কেজি। চাহিদা বেশি ভালো মানের গুড়ে। ১০ মণ ক্রয় করলাম এবং অর্ডার দিলাম ৩০ মণ।’ 

সিরাজগঞ্জ বড় বাজারের গুড় ব্যবসায়ী আনিছুর রহমান জানান, ‘খাঁটি খেজুরের পাটালি গুড় খুচরা ২৫০ থেকে ৩০০ কেজি ও ঝোলা গুড় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি। তবে কিছু গুড় রয়েছে ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি। কিন্তু শীত মৌসুমে খেজুর রসের পিঠা, পায়েস, গুড়ের মুড়ি-মুড়কি জন্য ভালো মানের গুড় নিচ্ছেন। বাজারে ভালো মানের খেজুরের গুড়ের চাহিদা বেশি’ ।

সিরাজগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. রাম পদ রায় বলেন, ‘বাদুড় থেকে নিপাহ ভাইরাস ছড়ায়। খেজুরের রস থেকে মানুষের শরীরে এ ভাইরাস এসেছে। তাই খেজুরের কাঁচা রস খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। যদিও কেউ খেজুরের কাচা রস খেতে চান তাহলে রস সংগ্রহের পর আগুনে ৭০-৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপে কিছু উত্তপ্ত করলেই ভাইরাস মরে যাবে। আমি মানুষকে সচেতনতার জন্য খেজুর রস খাওয়া থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করছি।’ 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (উপ-পরিচালক) বাবলু কুমার সূত্রধর বলেন, ‘জেলার বিভিন্ন উপজেলার মেঠো পথ ও বাড়ির আঙ্গিনায় পর্যাপ্ত খেজুর গাছ ছিলো। খেজুর গাছ পরিবেশ বান্ধব সাশ্রয়ী একটি বৃক্ষ প্রজাতি। বিভিন্ন কারণে এ গাছের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এতে কমে যাচ্ছে গুড়ের উৎপাদনও।’ 

তিনি আরও জানান, ‘জেলায় ৪ হাজার ২৫০টি খেজুরের গাছ রয়েছে। শীত মৌসুমে খেজুর রস ও গুড় বিক্রি করে কৃষকেরা আর্থিক লাভবান ও স্বাবলম্বী হওয়ার দৃষ্টান্ত বেশ সুপ্রাচীন। গ্রামীণ অর্থনীতি এবং মৌসুমি কর্মসংস্থানে খেজুর গাছের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। চলতি বছরে ১ লক্ষ ১৪ হাজার ৭৫০ কেজি খেজুরের গুড়ের বাজার মূল্য প্রায় ২ কোটি ২৯ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য আমরা কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি, যেন তারা আরও খেজুরের গাছ লাগায়।’ 

সংবাদটি প্রথম প্রকাশিত হয় বার্তা ২৪-এ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *