জয়পুরহাটের বাজারে ভারতীয় গরুর প্রাধান্য

জয়পুরহাটের খবর

শামীম কাদির, জয়পুরহাট: জয়পুরহাটে কোরবানির পশুহাটে এবার দেশি জাতের গরুর চেয়ে ভারতীয় গরু উঠেছে অনেক বেশি। ভারত থেকে অবৈধভাবে পাচার হয়ে আসা এসব গরু প্রকাশ্যে পাঁচবিবি ও সদরের নতুনহাটে কেনাবেচা হচ্ছে। সারা দেশ থেকে পাইকাররা এসে কম দামে এসব গরু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে দেশীয় গরুর খামারিরা বেকায়দায় পড়েছেন।
গত মঙ্গলবার পাঁচবিবি গোহাটি ও গতকাল বুধবার জয়পুরহাট শহরের নতুন হাটে দেশি-বিদেশি মিলে গোবাদি পশুর ব্যাপক সমারোহ। দেশি জাতের চেয়ে ভারতীয় গরুই বেশি চোখে পড়ে হাট দুটোতে। বিক্রেতারা জানান, কয়েক দিন ধরে রাত-দিন মিলে এ অঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্ত পথে বিজিবির নিরাপত্তা কর্মীদের সামনে দিয়ে ভারত থেকে এসব গরু পাচার করে আনা হচ্ছে।
জালাল উদ্দিন নামে এক খামারি জানান, হাটে ওঠা এসব গরু রাতের অন্ধকারে হিলির উচনা ও শিমুলতলী সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। দুই থেকে তিন মাস আগে ভারত থেকে পাচার হয়ে আসা কিছু গরু স্থানীয় খামারেও মোটাতাজাকরণ করা হয়েছে। ঈদ সামনে রেখে খামারে মোটাতাজাকরণ এসব ভারতীয় গরু এখন এ এলাকার সব হাটে তোলা হয়েছে। বলতে গেলে, দেশীর চাইতে ভারতীয় গরুর সরবরাহই এখন হাটগুলোতে বেশি।
ফেনী থেকে এ হাটে গরু কিনতে আসা পাইকারি ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম জানান, তিনি বছরের বেশিরভাগ সময় এ হাটে আসেন। সারা বছরই এ হাটে ভারতীয় গরুর প্রচুর আমদানি হয়। এখানে কম দামে গরু পাওয়া যায়। ভারতীয় গরু কিনতেই মূলত এ হাটে আসেন তিনি। আজকেও বেশ কয়েকটি ভারতীয় গরু কিনেছেন। চট্টগ্রাম-ফেনী অঞ্চলে কোরবানির হাটে এ গরুগুলোর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। কেননা গরুগুলো দেখতে বেশ চমৎকার। তাই বিক্রি করে মোটামুটি লাভও হয়।
পাঁচবিবি উপজেলার খাসবাট্টা গ্রামের ফারুক হোসেন জানান, কিছুদিন আগে এ হাট থেকে একটি ভারতীয় গরু কিনে তা খামারে মোটাতাজা করার পর হাটে বিক্রি করতে এনেছেন। ব্যাপারীরা এ গরুর দাম দেড় লাখ হাঁকছেন। এ দামে বিক্রি করলে তার মোটামুটি লাভ টিকবে।
রাজধানীর শনিরআখড়া থেকে গরু কিনতে আসা পাইকারি ব্যবসায়ী আলী আজম জানান, ভারতীয় গরু কেনার জন্যই তিনি এ হাটে এসেছেন। ভারতীয় তিনটি গরু সাড়ে চার লাখ টাকায় কিনেছেন। আরও গরু কিনবেন। ভারতীয় গরুর দাম তুলনামূলক কম। বিক্রি করতেও সময় বেশি লাগে না। তাছাড়া অল্প সময়ে বেশি লাভও হয়।
ক্ষেতলাল উপজেলার মহিষমুণ্ডা গ্রামের খামারি বাবর আলী জানান, তার খামারে ১২টি ভারতীয় গরু ছিল। ইতোমধ্যে ৯ লাখ টাকায় আটটি গরু বিক্রি করেছেন। আরও চারটি ভারতীয় গরু আছে। এ হাটে সেগুলো বিক্রি করতে এসেছেন। ছয় লাখ টাকা দাম পেলে এ চারটি গরুও বিক্রি করবেন। ভারতীয় গরুর কারণে দেশি গরুর খামারিরা বেকায়দায় পড়েছে। বাজারে দেশি গরুর চাইতে ভারতীর গরুই উঠেছে বেশি। চাহিদাও ভালো।
বগুড়া সদরের চাঁদমুয়া গ্রামের বাদশা মিয়া ১৫ মণ ওজনের একটি ভারতীয় ষাঁড় বিক্রি করতে এসে জানান, কয়েক মাস আগে ভারতীয় ৬টি গরু এ হাট থেকে কিনেছিলেন। চারটি গরু বিক্রি করেছেন। আজ একটা বিক্রি করতে এসেছেন। দুই লাখ টাকা দাম পেলে বিক্রি করবেন। সব খরচ বাদে এবার ভারতীয় গরু বিক্রি করে তার লাভ টিকবে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা।
ক্ষেতলাল উপজেলার মহব্বতপুর গ্রামের আবদুল বারিক ছয়টি ভারতীয় গরু বিক্রি করতে এসে জানান, ৬০-৭০ হাজার টাকা দরে কয়েক মাস আগে এসব ভারতীয় গরু এ হাট থেকে কিনেছিলেন। চারটি ছয় লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। অন্য দুটি চার লাখ পেলে বিক্রি করবেন।
হাটে দেশি গরু বিক্রি করতে আসা কালাই উপজেলার হাতিয়র গ্রামের রুহুল আমিন জানান, এ হাটে দেশি গরুর চেয়ে ভারতীয় গরুর উঠেছে বেশি। ভারতীয় গরু বেশি এবং দাম কম হওয়ায় দেশি গরু কেনাবেচা কম। অনেকেই দেশি গরু বিক্রি করতে না পেরে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মামুনুর রশিদ জানান, জয়পুরহাট জেলায় এবার কোরবানির জন্য পশুর দরকার এক লাখ ২০ হাজার। মজুদ রয়েছে এক লাখ ২৫ হাজার পশু। এখন হাটে ভারতীয় গরুর সরবরাহ বেশি।
বিজিবির ২০ ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক লেফটেন্যোন্ট কর্নেল রাশেদ মোহাম্মদ আনিসুল হক জানান, নিয়ন্ত্রণাধীন ৪০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকার সিংহভাগই কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে। বিজিবির সদস্যদের কঠোর অবস্থানের কারণে সব ধরনের চোরাচালান বন্ধ আছে। বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব পথে ভারতীয় গরু আনা অসম্ভব। যাও কিছু এসছে, সেগুলো এ পথে নয়, অন্য কোনো সীমান্ত হয়ে আসতে পারে।
জয়পুরহাটের পুলিশ সুপার রশিদুল হাসান জানান, কোরবানির হাটে ভারতীয় গরু কেনাবেচা হওয়ার বিষয়টি পুলিশের জানা নেই।