সারাদেশ

প্লেনে সবুজ জ্বালানির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করছে সিঙ্গাপুর, বাড়বে খরচ

ডেস্ক রিপোর্ট: পারিবারিক ও পেশাগত কারণে আমি এখন থাইল্যান্ডে অভিবাসী। থাইল্যান্ডে, বিশেষত ব্যাংককে থাকার সুবিধা হচ্ছে এখানে দেশ থেকে আসা মানুষের দেখা পাওয়া যায় নিয়মিত। থাইল্যান্ড যেহেতু বাংলাদেশিদের জন্য শ্রম বাজার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত না, ফলে কাছের দেশ হলেও অভিবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা কম। বরং পর্যটকের সংখ্যাই বেশি।

থাইল্যান্ডে বেড়াতে আসা অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, এদের ইংরেজি জ্ঞানের খুব অভাব রয়েছে। তবে ভাষার এই সমস্যা থাকলেও পুরো থাইল্যান্ড আপনি চষে বেড়াতে পারবেন। এখানকার মানুষ বিদেশিতে এতোটাই অভ্যস্ত যে আকার ইঙ্গিতে মনের ভাব কোথাও আটকে থাকবে না। হয়তো কখনো আমাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে পারে।

পশ্চিমাদের প্রতি থাইল্যান্ডের মানুষের দুর্বলতা রয়েছে। এশিয়ার এই দেশটি কখনো সরাসরি কারো উপনিবেশ ছিলো না। বরং থাইল্যান্ডকে উন্মুক্ত বাজার করে দিয়েছিলেন এখানকার রাজারা, যখন কিনা ইউরোপের শিল্প বিপ্লব ঘটে। থাইল্যান্ডের মানুষ যে ইংরেজিতে দুর্বল এতে তারা গর্ববোধও করেন।

থাইরা জাতি হিসেবে একটু লাজুক প্রকৃতির। তবে বলে রাখি বেড়াতে আসলে সুকুমভিত বা পাতায়ার ওয়াকিং স্ট্রিটে যে থাইল্যান্ডকে দেখা যায়, গভীরে প্রবেশ করলে ততোটাই রক্ষণশীলতার দেখা মিলবে। ভিনদেশিদের সহজে নিজেদের আঙিনায় ঢুকতে দিবে না। লজ্জা দুর্বলতাটা এখানে ইংরেজির ব্যবহারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় অনেক সময়। এখানকার স্নাতক পাশ করা শিক্ষার্থীদের সকলেরই ইংরেজি কোর্স রয়েছে। তাই চলার মতো ইংরেজি তাদের বলতে পারার কথা। কিন্তু ইংরেজি বলতে ‘ভুল হবে’ এই ভেবে লজ্জায় ভোগেন তারা। তাই না বলাটাকেই উপযোগী মনে করেন তারা।

তবে আমার দেখা দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের মধ্যে নিজের ভাষা নিয়ে যে হীনমন্যতা, সেটা ঔপনিবেশিক দাসত্বের চূড়ান্ত রূপ। একটা দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করি। থাইল্যান্ডে পর্যটক এলাকাগুলো ছাড়ালে ইংরেজি বলা মানুষ পাওয়া দুষ্কর হবে। আমার যখন সন্তান হয়, তখন থাইল্যান্ডের একটি বিভাগীয় শহরের হাসপাতালে পরিচালক থেকে শুরু করে কাউকে পাইনি যারা ইংরেজিতে যোগাযোগ করতে পারে। তবে গুগল ট্রান্সলেটে যোগাযোগ বন্ধ হয়নি।

এই যে ভিনদেশী ভাষাকে এতো ভাল রপ্ত না করার ফল কি জানেন?

অ্যাপল থেকে শুরু করে সব ব্র্যান্ডের ডিভাইসে থাই বর্ণমালা রয়েছে। হলিউডের যে কোন সিনেমা যেমন আমাদের দেশে প্রথম দিনেই মুক্তি পায়, সেটা থাইল্যান্ডে মুক্তি পায় এক সপ্তাহ পর। কারণ একটা ভার্সন বের হয় থাই ডাবিংসহ, আরেকটা ভার্সন থাই সাবটাইটেলসহ। নেটফ্লিক্সে সাবটাইটেলের তালিকায় থাই ভাষা রয়েছে। ডাবও রয়েছে।

ফলে থিয়েটারে ইংরেজভাষী বাঙালির মতো না বুঝে হাসতে বা মুখ চাওয়া হতে হয় না। দুনিয়াজুড়ে থাই ভাষাভাষী জনসংখ্যা কম বেশি ৬ কোটি। আমাদের অর্ধেকেরও কম। কিন্তু এই ভাষাভাষী মানুষের চিকিৎসা বা প্রকৌশলের মতো উচ্চশিক্ষার বইগুলো সব থাই ভাষায়। পশ্চিমের বড় লেখকের বই ইংরেজির পাশাপাশি থাই ভাষায় অনুবাদ হয়ে আসে মার্কেটে।

আমার স্ত্রী এবং থাই বন্ধুদের কখনো দেখিনি অফিসের ইমেইল ইংরেজিতে লিখতে। অথচ আমরা বাংলাদেশে পাশের সহকর্মীকেও ইংরেজিতে ইমেইল করি। যে ইমেইলে কোন বিদেশি নাই, যে অনুষ্ঠানে কোন বিদেশি নাই, সেখানেও ইংরেজিতে উপস্থাপনা করি, কথা বলি। এতে বড় সমস্যা হচ্ছে, এর ফলে অনেক মানুষ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও আলোচনায় অংশ নিতে পারেন না। অথচ হয়তো তিনি অংশ নিতে পারলে তার কোন ভাবনাই নতুন কোন দিগন্তের উন্মোচন করতে পারতো।

আমাদের দেশে আপনি বাংলায় অফিসিয়াল ইমেইল লিখার কথা ভাবতে পারেন! ভিনদেশি ভাষা অতিরিক্ত গুণ, আবশ্যক কখনোই হতে পারে না। শুধুমাত্র আপনারা বাংলাকে আজ দ্বিতীয় স্তরের ভাষা ভাবাতে অনেক প্রতিভার বিকাশ হতে পারে না। যেমন ধরেন একজন যুবক খুব সৃষ্টিশীল, বাংলায় ভাল কবিতা লিখেন।

থাইল্যান্ডকে উদাহরণ হিসেবে বললাম, ছোটো একটা ভাষা গোষ্ঠী কিভাবে নিজ ভাষার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।

আমার নিজের ইংরেজি ভাল না। একসময় খুব হীনমন্যতায় ভুগতাম বিদেশের মাটিতে। তবে একবার আমার এক আমেরিকান শিক্ষক বললেন, ইংরেজিতো তোমার মাতৃভাষা না। তোমাকে কেন সেটা শুদ্ধভাবে পারতে হবে! ভাষাটা বোঝাতে পারলেই হবে। আমি কি তোমার ভাষা দু বছর শিখলেও সঠিকভাবে বলতে পারবো? তাই জড়তা ঝেড়ে বলো।

আমরা যতই ইংরেজি বলি বা পাসপোর্ট পরিবর্তন করে খোলস পাল্টাতে চাই, আসলে আমাদের চামড়া কিন্তু সেটা বদলাতে দিবে না। কারণ চামড়া আর ভাষা, দুটোই আমাদের জাতের প্রকাশ। তাই এই খোলস না পাল্টে আমাদের ভাষা তার প্রয়োজনীয়তা দুনিয়াজুড়ে তৈরি করতে কেন ব্যর্থ হচ্ছে সেটা খুঁজে বের করি। অথচ বাংলা পৃথিবীর প্রায় ৩০ কোটি মানুষের মুখের ভাষা। দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন প্রায় সাড়ে ৩ কোটি মানুষ।

তাই ভাষার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে থাই ল্যাঙ্গুয়েজ লার্নিং সেন্টারগুলোতে বিদেশিদের ভিড়। এর বড় কারণ এরা থাই অর্থনীতির অংশ হতে চায় অথবা এখানে বিনিয়োগ করতে চান। ফলে ভাষা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। থাই অর্থনীতির অংশ হওয়া মানে এখানে বাজার রয়েছে যেখানে পণ্য বেচাকেনা সম্ভব। আর বাজারে থাই ভাষাভাষী মানুষেরও প্রাধান্য রয়েছে। যে কারণে সব টেক ডিভাইসে থাই ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে।

ভাষার চর্চার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক যেমন রয়েছে তেমনি ভাষার চর্চাটাও করে যেতে হয়। বাংলা ভাষায় নতুন শব্দ তেমন খুঁজে পাবো না আমরা। কারণ ভাষা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাজ হয়না। তবে থাইল্যান্ডে উড়োজাহাজ, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, চেয়ার, টেবিল, মিস কল, কল, এই ধরনের সকল শব্দের থাই শব্দ রয়েছে।

ভাষার জন্য জীবন দেওয়া একটি জাতি, নাম বাঙালি। বাংলাদেশে, আসামে বাংলা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছি আমরা। অথচ গত প্রায় ৭৫ বছরেও নিজেদের ভাষাকে ব্যবহারের মাধ্যমে সম্মানিত করতে পারিনি, তৈরি করতে পারিনি ভাষার প্রয়োজনীয়তা।

সংবাদটি প্রথম প্রকাশিত হয় বার্তা ২৪-এ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *