আন্তর্জাতিক

বদলে গেছে বুড়িগঙ্গা, বদলায়নি আহসান মঞ্জিল

ডেস্ক রিপোর্ট: বদলে গেছে বুড়িগঙ্গা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কত স্রোত বয়ে গেছে এ নদী দিয়ে। বদলে গেছে নদীপাড়ের মানুষের জীবনযাত্রা। হারিয়ে গেছে বুড়িগঙ্গার সেই খরস্রোতা রূপ। নেই সেই ভরা নদীর সৌন্দর্য, নেই মোঘল নবাবদের সেই বিচরণও! তবু কালের সাক্ষী হিসেবে রয়ে গেছে মোঘল আমলের বাকরখানি। রয়েছে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সেই শাহী বিরিয়ানি। সেইসঙ্গে বুড়িগঙ্গার তীরে এখনো মাথা উঁচু করে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিল।

কালের সাক্ষী ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এই নিদর্শনকে নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল রয়েছে পর্যটনপ্রেমী মানুষদের।

রাজধানী ঢাকাকে বলা হয়—যাদুর শহর। রাজধানী ঢাকার কর্মব্যস্ত ভ্রমণপিপাসু বাসিন্দারা একটু অবসর পেলেই ছুটে আসেন বুড়িগঙ্গার তীরে, আহসান মঞ্জিলে। এক সময় এটি নবাবদের আবাসিক ভবন ও জমিদারদের সদর কাছারি হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

আহসান মঞ্জিল

দোতলা ভবন। ভবনের দেওয়ালে নান্দনিক কারুকার্য। দোতলা থেকে একটি বড় সিঁড়ি নেমে এসে মিশে গেছে সবুজ মাঠের সঙ্গে। সামনেই রয়েছে চমৎকার ফুলের বাগান। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বুড়িগঙ্গা। দোতলা এই প্রাসাদের প্রতিটি কক্ষ অষ্ট-কোণ বিশিষ্ট। ভবনের ভেতরে রয়েছে খাবার ঘর, দরবার হল, বিলিয়ার্ড খেলার ঘর এবং জলসাঘর। মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে প্রাসাদের বারান্দা ও মেঝ। এই প্রাসাদের দ্বিতীয়তলায় গেলে দেখা যাবে, অতিথিদের থাকার কক্ষ, বৈঠকখানা, গ্রন্থাগার, নাচঘর এবং বসবাসের আরও কিছু কক্ষ।

আহসান মঞ্জিল মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। পূর্ব পাশের গম্বুজযুক্ত অংশ হলো—প্রাসাদ ভবন বা রঙমহল আর পশ্চিমাংশের ভবনকে বলা হয়—অন্দরমহল।

আহসান মঞ্জিল ঢাকা শহরের প্রথম ইটপাথরের ভবন বলে মিথ রয়েছে। এর নির্মাণকাজ শুরু হয়, ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে আর শেষ হয় ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে। ২৩টি গ্যালারিসহ এই ভবনে প্রায় সাড়ে চার হাজার প্রদর্শনীর জিনিসপত্র রয়েছে।

বর্তমানে আহসান মঞ্জিল ঢাকার ইতিহাসের ‘জাদুঘরে’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে—নবাব আমলের ডাইনিং রুম, আলমারি, সিন্দুক, নবাব আমলের বিভিন্ন ধরনের অলঙ্কৃত রূপা ও ক্রিস্টালের তৈরি চেয়ার-টেবিল, বড় বড় আয়না, কাচ ও চীনামাটির থালা-বাসন, হাতির মাথার কঙ্কাল, বিভিন্ন ধরনের তৈলচিত্র, আতরদানি, ফুলদানি, পানদানসহ আহসান মঞ্জিলের মডেল।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার মোগল সূত্রীয় নবাবের প্রতিনিধি নায়েবে নাজিম বংশের বিলুপ্তি ঘটে। তখন মুসলমানদের সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে শূন্যতা দেখা দেয়। এই শূন্যতা পূরণে এগিয়ে আসে কুমারটুলীর খাজা পরিবার। এই পরিবার প্রায় শতবর্ষ ধরে নেতৃত্ব দেয়।

আর্থিক ও বিবিধ জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন ধরনের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ব্রিটিশ সরকার খাজা পরিবারকে ‘নবাব’ উপাধি ব্যবহারের অধিকার দেয়। এর ফলে পরবর্তীতে ঢাকার নবাব পরিবার হিসেবে তারা পরিচিতি লাভ করে।

ঐতিহাসিকদের মতে, প্রাক মোগল সুলতানি আমলে এলাকার নামকরণ করা হতো সাধারণত ওই এলাকার বাসিন্দাদের পেশা অনুযায়ী। রাজধানীর তাঁতিবাজার, শাখারী বাজারসহ প্রভৃতি মহল্লা আজও সেই বাসিন্দাদের পেশার পরিচিতি বহন করছে।

মোগল সুবেদার ইসলাম খান ঢাকায় এসে বুড়িগঙ্গার তীরে প্রথম পদার্পণ করেছিলেন। পরবর্তীতে তার নামানুসারে এই এলাকার নামকরণ করা হয় ইসলামপুর।

অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জামালপুর পরগনার জমিদার শেখ ইনায়েতউল্লাহ আহসান মঞ্জিলের বর্তমান স্থান রঙমহল নামে একটি প্রমোদভবন তৈরি করেন। পরে তার ছেলে শেখ মতিউল্লাহ এটি ফরাসি বণিকদের কাছে বিক্রি করেন। তারপর থেকে রঙমহলটি দীর্ঘদিন বাণিজ্য কুঠি হিসাবে পরিচিত ছিল।

পরবর্তীতে ১৮৩০ সালে বেগমবাজারে বসবাসকারী নওয়াব আবদুল গণির পিতা খাজা আলীমুল্লাহ রঙমহলটি কিনে নেন। ১৮৫৯ সালে আবদুল গণি প্রাসাদটি নির্মাণ শুরু করে কাজ শেষ করেন ১৮৭২ সালে। নির্মাণের পর তিনি তার প্রিয় ছেলে খাজা আহসানুল্লাহর নামানুসারে প্রাসাদটির নামকরণ করেন আহসান মঞ্জিল।

টিকিট:

আহসান মঞ্জিলে ঢুকতে হলে জনপ্রতি ৪০ টাকা করে টিকিট কেটে নিতে হয়। অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য জনপ্রতি ২০ টাকা। সার্কভুক্ত নাগরিকদের জন্য প্রতিটি টিকিটের মূল্য ৩০০ টাকা। অন্যান্য দেশের নাগরিকদের জন্য ৫০০ টাকা। আহসান মঞ্জিল বন্ধের আধঘণ্টা আগ পর্যন্ত টিকিট পাওয়া যায়।

সময়সূচি:

আহসান মঞ্জিল প্রতি বৃহস্পতিবারসহ অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে বন্ধ থাকে। শীতের সময়ে (অক্টোবর থেকে মার্চ) শনি থেকে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত, শুক্রবার দুপুর আড়াইটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

গ্রীষ্মকালে (এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর) শনি থেকে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। শুক্রবার খোলা থাকে বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত।

যেভাবে যাবেন:

দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বাস, ট্রেন, লঞ্চসহ যেকোনো বাহনে করে প্রথমে ঢাকায় আসতে হবে। বাসে সায়েদাবাদ/যাত্রাবাড়ী আসার পর সেখান থেকে রিকশা বা ট্যাক্সিক্যাব উবারে করে আসতে পারেন। এছাড়াও বাহাদুর শাহ পরিবহনের মিনি বাসে করে আসতে পারেন বাহাদুর শাহ পার্ক/জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত। পরে রিকশা বা পায়ে হেঁটে ১০-১৫ মিনিটে আহসান মঞ্জিলে আসা যাবে।

রাজধানীর মহাখালী থেকে আসলে স্কাইলাইন ও আজমেরী পরিবহন বাসে করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আসা যাবে।

গাবতলী থেকে এলে সাভার পরিবহন বাসে আসা যাবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত। তারপর রিকশায় অথবা হেঁটে আসা যাবে।

ট্রেনে এলে কমলাপুর থেকে উবার কিংবা রিকশা নিয়ে আসা যাবে। লঞ্চে এলে সদরঘাট টার্মিনাল থেকে ১০ মিনিট হাঁটলেই আহসান মঞ্জিল।

সংবাদটি প্রথম প্রকাশিত হয় বার্তা ২৪-এ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *